ধ্রুব এষ : রেখা, শব্দ ও কল্পনার সমান্তরাল যাত্রা
- আপলোড সময় : ২৪-০১-২০২৬ ০৯:১৯:২০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৪-০১-২০২৬ ০৯:১৯:২০ পূর্বাহ্ন
এহসান হায়দার::
বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের পরিসরে ধ্রুব এষ একটি স্বতন্ত্র নাম। তিনি একই সঙ্গে লেখক, চিত্রশিল্পী এবং প্রচ্ছদশিল্পী, কিন্তু এই পরিচয়গুলোর কোনোটিই একা দাঁড়িয়ে নেই। ধ্রুব এষের শিল্পচর্চা মূলত এক আন্তঃসম্পর্কিত জগৎ, যেখানে রেখা শব্দকে স্পর্শ করে, আর শব্দ আবার ছবির দিকে হাত বাড়ায়। তার সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি আলাদা মাধ্যমে কাজ করলেও সবকিছুর মধ্যে এক ধরনের নীরব সংলাপ বজায় রাখেন।
ধ্রুব এষের প্রচ্ছদশিল্প ভাবনা বাংলা প্রকাশনা জগতে এক বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার আঁকা প্রচ্ছদ কখনই কেবল বইয়ের মোড়ক নয়; তা বইয়ের ভাবনার প্রথম দরজা। তিনি প্রচ্ছদকে অলংকরণ হিসেবে দেখেন না, বরং পাঠের পূর্বাভাস হিসেবে ব্যবহার করেন। তার প্রচ্ছদে প্রায়ই দেখা যায় সংযমী রঙ, ইঙ্গিতময় রেখা এবং এক ধরনের শূন্যতা, যা পাঠককে কৌতূহলী করে তোলে। এই শূন্যতা আসলে ফাঁকা নয়, বরং ভাবনার জায়গা। পাঠক বই হাতে নেওয়ার আগেই সেই শূন্যতার ভেতর গল্পের সম্ভাবনা দেখতে পান। প্রচ্ছদশিল্পে ধ্রুব এষের বড় শক্তি হলো, তিনি পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার দিকে ঠেলে দেন না। তার ছবিতে প্রতীক থাকে, কিন্তু তা কঠোর নয়; ইশারা থাকে, কিন্তু নির্দেশনা নয়। ফলে বইয়ের ভেতরের ভাষা ও বহিরাবরণের ছবির মধ্যে এক ধরনের সহাবস্থান তৈরি হয়, যেখানে কেউ কাউকে গ্রাস করে না।
বড়দের জন্য লেখা ধ্রুব এষের সাহিত্যে রয়েছে এক ধরনের মৃদু অথচ গভীর দার্শনিক সুর। তার গল্প ও গদ্যে সরল ঘটনাপ্রবাহের আড়ালে থাকে অস্তিত্ব, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি ও সময়ের প্রশ্ন। তিনি উচ্চকণ্ঠে কথা বলেন না; তার ভাষা ধীর, কখনও প্রায় নিঃশব্দ। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তীক্ষè পর্যবেক্ষণ। মানুষ, সমাজ ও সময়কে তিনি দেখেন খানিকটা দূরত্ব রেখে, যেন খুব কাছে গেলে সত্য ধরা পড়বে না।
ধ্রুব এষের বড়দের সাহিত্য পাঠকের কাছে কোনো প্রস্তুত সিদ্ধান্ত হাজির করে না। বরং পাঠককে ভাবনার ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। তার চরিত্ররা প্রায়ই অসম্পূর্ণ, দ্বিধাগ্রস্ত, প্রশ্নবিদ্ধ- ঠিক যেমন আধুনিক মানুষ। এই অস¤পূর্ণতাই তার লেখার সবচেয়ে মানবিক দিক।
অন্যদিকে ধ্রুব এষের শিশুসাহিত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ তৈরি করে, যেখানে জটিলতা নয়, কৌতূহল মুখ্য। তবে এই সরলতা কখনই শিশুসুলভ অবহেলায় পরিণত হয় না। তিনি শিশুদের ছোট মানুষ হিসেবে দেখেন না; বরং ভিন্ন অভিজ্ঞতার মানুষ হিসেবে দেখেন। তাই তার শিশুসাহিত্যে কল্পনা থাকে, কিন্তু তা বাস্তববিচ্ছিন্ন নয়; আনন্দ থাকে, কিন্তু তাতে বুদ্ধির অবমাননা নেই।
শিশুসাহিত্যে তার ভাষা সহজ, ছন্দময় এবং দৃশ্যধর্মী। গল্প পড়তে পড়তে শিশু যেন ছবির ভেতর ঢুকে পড়ে- এখানেও তার চিত্রশিল্পী সত্তা সক্রিয়। শব্দ দিয়ে তিনি ছবি আঁকেন, আর ছবির ভেতর দিয়ে গল্প বলেন। ফলে তার শিশুসাহিত্য শুধু পাঠযোগ্য নয়, যেন ক্যানভাসে এঁকে যাওয়া ছবি দেখার মতোও।
সব মিলিয়ে ধ্রুব এষ এমন একজন ¯্রষ্টা, যিনি শিল্পের বিভিন্ন শাখাকে আলাদা করে দেখেন না। তার কাছে লেখা, আঁকা, প্রচ্ছদ- সবই একই অনুসন্ধানের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। এই অনুসন্ধান মানুষের ভেতরের জগৎকে বোঝার চেষ্টা। রেখা ও শব্দের এই যুগল অভিযাত্রায় ধ্রুব এষ বাংলা সাহিত্য ও শিল্পকে দিয়েছেন এক স্বতন্ত্র, সংবেদনশীল ও দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গি।
জন্মদিনে ধ্রুবদাকে দেখি সেই প্রথম দেখার মতো, অপার আগ্রহ আর অনুভূতির ভেতর দিয়ে- যেবার তার থেকে নেওয়া প্রথম লেখাটির সব চন্দ্রবিন্দু কেটে ফেলেছিলাম। পত্রিকা ছাপানোর পর তিনি বলেছিলেন, ‘করেছ কী! বাংলা বর্ণের সৌন্দর্য চন্দ্রবিন্দু- সব ফেলে দিয়েছ!’
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক